বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০২:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মামলা: আন্তর্জাতিক আদালতে লড়বেন সু চি জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন সাংবাদিক দীপক শর্মা দীপু এতিমখানার নিবন্ধন বহাল,টাকা আত্মসাত, মানবন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল প্রেসক্লাবের সকল অনুষ্ঠানমালা বর্জনের ঘোষনা বান্দরবানে কর্মরত সাংবাদিকদের জাহাজ প্রস্তুত রোহিঙ্গারা যাবে ভাসানচরে লবণ গুজব’ ঠেকাতে মাঠে প্রশাসন, আটক শতাধিক পালংখালীতে ‘ইউএনও কলেজ’এর জন্য এনজিও গুলোর সহায়তা চাইলেন উখিয়ার ইউএনও স্থানীয়দের নগদ অর্থ নয়, গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করুন : ইউএনও নিকারুজ্জামান চাহিদার চেয়ে দেশে ২ লাখ ২৪ হাজার টন লবণ বেশি ট্রাভেল টিউবার এক দম্পতির ভ্রমণনেশা

চট্টগ্রামে দেড় দশকে হামলা ও হুমকির শিকার শতাধিক সাংবাদিক

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯
  • ৭১ জন দেখেছে

পাথরঘাটায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিনষ্টের চেষ্টার ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুরুতর আহত চ্যানেল আইয়ের তৎকালীন ক্যামেরাম্যান শফিক আহমেদ সাজিব

শরীফুল রুকন : সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা সরকারিভাবে বলা হলেও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা ও হুমকির শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। চট্টগ্রামে সাংবাদিকের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতনের অজস্র ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর কোনো আইনি প্রতিকার হয়নি।

এর ফলে দুষ্টু লোকেরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাতে উৎসাহিত হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা যেন একটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে যেমন জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, বোমা হামলা ও দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন; তেমনি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণমাধ্যম। এখন বিচারহীনতা, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও হুমকির মুখোমুখি।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে সংবাদমাধ্যম সুরক্ষা আইন পাস হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রে কোনো সাংবাদিককে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা, আক্রমণের চেষ্টা করা কিংবা প্ররোচিত করা, তাঁর সম্পদের ক্ষতিসাধন করা, কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের সম্পদের ক্ষতিসাধন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধের শাস্তি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড, ৫০ হাজার রুপি জরিমানা অথবা একই সঙ্গে উভয় দণ্ড। এ ছাড়া অপরাধের শিকার সাংবাদিকের চিকিৎসার ব্যয়বহন করা, তাঁর কোনো সম্পদের ক্ষতি করে থাকলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। মামলার অভিযোগ কগনিজিবল বা আমলযোগ্য এবং আসামি জামিন লাভের অযোগ্য। শুধু উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারাই মামলার তদন্ত করবেন।

তবে নিজেদের সুরক্ষার জন্য চট্টগ্রাম তথা দেশের সাংবাদিকেরা এ রকম কোনো আইন প্রবর্তনের দাবি তোলেননি, যদিও দাবি তোলার পক্ষে যথেষ্ট কারণ সৃষ্টি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ হায়দারের ওপর হামলা করা হয়। এতে তিনি আহত না হলেও তার সঙ্গে থাকা ল্যাপটপটি নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী’ স্লোগান দিয়ে সংঘটিত হামলায় যুগান্তরের আলোকচিত্রী রাজেশ চক্রবর্তী, ইনকিলাবের আলোকচিত্রী কুতুব উদ্দিন, মাছরাঙার ক্যামেরাম্যান রবিউল টিপু, এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান ফরিদ উদ্দিন ও এটিএন নিউজ এর ক্যামেরাম্যান অমিত দাশ আহত হন।

২০১২ সালের ১৩ মে জামায়াতের কর্মীদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্র সাংবাদিক সুমন বাবু, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্র সাংবাদিক উজ্জ্বল ধর, যায়যায়দিনের আলোকচিত্র সাংবাদিক মশিউর রেহমান বাদলসহ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হালিশহরের একটি ভোটকেন্দ্রে পেশাগত দায়িত্বপালনকালে আহত হন টেলিভিশনটির ওইসময়কার সিনিয়র রিপোর্টার আজাদ তালুকদার

২০০৫ সালের রমজান মাসে সাংবাদিকদের উপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে নগরের চেরাগী পাহাড় এলাকায়। ভোরের কাগজের তৎকালীন ব্যুরো প্রধান ওমর কায়সারের স্ত্রী জ্যোৎস্না কায়সার কেয়া ম্যানসনের সামনে একটি প্রাইভেট কারের উপর হাতব্যাগ রাখাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রেজাউল করিম আজাদের গাড়িচালক জোৎস্না কায়সারের সঙ্গে দুব্যবহার করে। এর প্রতিবাদ করলে ড্রাইভার ফোন করে রেজাউল করিমসহ বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে ডেকে নিয়ে আসে। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ওমর কায়সারের ওপর আক্রমণ করে। তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসলে ভোরের কাগজের তৎকালীন স্টাফ রিপোর্টার আলমগীর সবুজ, একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার ও একুশে পত্রিকার তৎকালীন সহ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের উপরও হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এতে তারা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের আন্দোলনের মুখে হামলাকারিরা গ্রেফতার হতে বাধ্য হন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতায় পরবর্তীতে হামলাকারিরা নিঃশর্ত ক্ষমা চান এবং ক্ষতিগ্রস্থ সাংবাদিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হন।

২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় বিরোধীদলীয় জোটের সমাবেশে দায়িত্ব পালনকালে শিবিরের হামলায় এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান ফরিদ উদ্দীনের পাশাপাশি বাংলা ভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান নাসির উদ্দিন তোতাও আহত হয়েছেন।

২০১১ সালের ১১ অক্টোবর নগরের পাথরঘাটার জলিলগঞ্জ এলাকায় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উগ্রপন্থী দুইপক্ষের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উচ্ছৃঙ্খল লোকজনের আক্রমণে মাথায় আঘাত লেগে গুরুতর আহত হন চ্যানেল আইয়ের তৎকালীন ক্যামেরাপারসন শফিক আহমেদ সাজিব।

২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের ওয়াসা মোড়ে সমাবেশের মধ্যে একাত্তর টিভির ক্যামেরাম্যান রাজীব বড়ুয়াকে লাঞ্ছিত করে এবং ক্যামেরা ভাঙার চেষ্টা চালায় হেফজতে ইসলামীর কর্মীরা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসা একাত্তর টিভির প্রতিবেদক মহিম মিজান ও ক্যামেরাম্যান তানভীরও হেফাজত কর্মীদের হামলার মুখে পড়েন। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।

২০১৩ সালের ১৬ জুলাই সকালে নগরীর বাদুরতলায় শিবিরের ছোড়া হাতবোমার আঘাতে বাংলাভিশনের ক্যামেরাম্যান ইসমাইল হোসেন পলাশ আহত হন।

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর স্টেশন রোড এলাকায় বিএনপিকর্মীদের ছোড়া হাতবোমা বিস্ফোরণে চ্যানেল আইর ক্যামেরাপার্সন শামসুল আলম বাবু এবং দেশ টিভির ক্যামেরাপার্সন মো. হাসান আহত হন।

২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার কলেজ রোডের মাথায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি জহিরুল ইসলামের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে তাঁর বাঁ পা ভেঙে যায়।

২০১৪ সালের ২১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তাসনীম হাসানকে হুমকি দিয়েছে চবি ছাত্রলীগের এক নেতা।

২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দৈনিক পূর্বদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফারুক আবদুল্লাহকে পিটিয়েছিল পুলিশ সদস্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক দেলোয়ার হোসেনের ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠে তখন।

খবরে নাম পরে থাকায় ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) সাংবাদিক সমিতির সভাপতি রাকিবুল হাসানকে ছাত্রলীগের এক নেতা মারধর করেন।

২০১৫ সালের ১১ মার্চ চট্টগ্রামের লালদিঘীতে নৈরাজ্য ও নাশকতাবিরোধী সমাবেশে ছাত্রলীগের হামলায় আহত হন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের চিত্রগ্রাহক শফিক সাজীব, বাধা দিতে গেলে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদক জামশেদুল করিমও হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা ক্যামেরা ও ট্রাইপড ভেঙে ফেলে। সহকর্মীদের বাঁচাতে এসে ছাত্রলীগকর্মীদের হামলার মুখে পড়েন সময় টেলিভিশনের পার্থ প্রতীম বিশ্বাস, একাত্তর টেলিভিশনের ক্যামেরামান জহিরুল ইসলাম, চ্যানেল নাইনের তৎকালীন ক্যামেরামান বিপ্লব মজুমদার, বাংলাভিশনের সাইফুল ইসলাম।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল সিটি নির্বাচনে দক্ষিণ হালিশহর কেজি অ্যান্ড হাইস্কুল কেন্দ্রের বাইরে সংঘর্ষের ছবি ধারণ করতে গিয়ে প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় চট্টগ্রামে তিনজন সাংবাদিক আহত হন। তারা হচ্ছেন একাত্তর টেলিভিশনের তৎকালীন সিনিয়র রিপোর্টার আজাদ তালুকদার, ক্যামেরাপারসন জহিরুল ইসলাম, আরটিভির তৎকালীন ক্যামেরাপারসন পারভেজুর রহমান ও দৈনিক পূর্বকোণের ফটো সাংবাদিক মিয়া আলতাফ। হামলায় দুটি ক্যামেরাও ভেঙে দেওয়া হয়।

২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর রাউজানের গহিরায় যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দাফনের খবর সংগ্রহ করে ফেরার পথে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন মোহনা টেলিভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরোর সাংবাদিক রাজিব সেন প্রিন্স।

২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নগরের প্রবর্তক মোড়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রথম আলোর আলোকচিত্রী জুয়েল শীলকে মারধর ও তাঁর সঙ্গে চরম অবমাননাকর আচরণ করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রাশেদুল ইসলামের নেতৃত্বে এই বর্বরোচিত হামলা সংঘটিত হয়।

২০১৬ সালের ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরীসহ পাঁচ ব্যক্তিকে ডাকযোগে এক চিঠি পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

২০১৬ সালের ২২ অক্টোবর বাঁশখালীর আলোচিত সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সাংবাদিক রাহুল দাশ নয়নকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠে।

২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে সময় টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান কমল দে, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের তৎকালীন বিশেষ প্রতিনিধি রমেন দাশগুপ্ত, জ্যেষ্ঠ ফটো সাংবাদিক উজ্জ্বল ধর, ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক অনুরুপ কান্তি দাশ টিটুকে লাঞ্ছিত করে ‘ঐক্যবদ্ধ সচেতন হিন্দু সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের কর্মীরা।

২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর নগরীর জামালখান এলাকায় হামলায় তৎকালীন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও যুগ্ম সম্পাদক স্বরূপ ভট্টচার্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কায়সার হামিদ ও সাখাওয়াত হোসেন নামে দুইজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেছিলেন রিয়াজ হায়দার।

২০১৮ সালের ৮ জুন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের হাতে নিউজ টোয়েন্টিফোরের ক্যামেরাপার্সন আহাদুল ইসলাম বাবু এবং চালক নুরুল আলম আহত হয়েছিলেন। চ্যানেলটির সাংবাদিক নয়ন বড়ুয়া জয়ও সে সময় লাঞ্ছিত হন।

২০১৮ সালের ২২ মে দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের স্টাফ রিপোর্টার সালাহ উদ্দিন সায়েমের পতেঙ্গা এলাকার বাসায় গিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদারকে সমাবেশ করে প্রাণনাশের হুমকি দেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের বিতর্কিত নেতা সামশুদোহা সিকদার প্রকাশ আরজু সিকদার। শুধু তাই নয়, সাংবাদিক আজাদ তালুকদারের ছবিতে ফাঁসির রসি ঝুলিয়ে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। যদিও এ ব্যাপারে হুমকির শিকার আজাদ তালুকদার এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা করেছেন।

উপরোক্ত এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা আইনী প্রতিকার পেয়েছেন-এমন দৃষ্টান্ত তেমন নেই। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। এটা শুধু সাংবাদিকতা পেশার জন্যই ক্ষতিকর নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর মনে করছেন সাংবাদিক নেতারা। তাই আজ সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি উঠেছে।

সাংবাদিকদের সুরক্ষা আইন বিষয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোল্লা জালাল একুশে পত্রিকাকে বলেন, যেখানে অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ সেখানে সুরক্ষা তো পরে। যেখানে লড়াই করে একটা ওয়েজবোর্ড হলো সেখানে গিয়ে মামলা লাগিয়ে দিলো। কোর্ট আবার এখন বলছে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। মালিকরা বলে যে তারা কোনো ওয়েজবোর্ড দেবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন আমি করবো মালিকরা টাকা না দিলে। তথ্যমন্ত্রী বলেন আমি দিতে পারি, কিন্তু মালিকদের বাধ্য করি কীভাবে। প্রেক্ষিতটা আপনাকে মাথায় রাখতে হবে। মাথায় রেখে পরে আপনি ডিমান্ডটা করতে পারবেন। সম্প্রতি দেশে যা ঘটছে আগের সময় এরকম ছিল না। প্রতিনিয়ত একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। এগুলো সমাজজীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনকে প্রভাবিত করছে। এখন ওয়েজবোর্ড তো একটা আইন, এটা ভাউচার না। এখন এটাই টেকানো যায় কিনা তাই ভাবছি। সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে আলাদা আইন রাষ্ট্র করবে কিনা, চাইলেই যে হবে এমন তো না। তাই সুরক্ষা আইনের আগে ওয়েজবোর্ড টেকানো যাবে কিনা এটাই এখন বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য আমরাও সুরক্ষা আইন চাই। শুধু ভারতের আদলে সুরক্ষা আইন করলে হবে না। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আরো যা যা করা দরকার, সব করতে হবে। ভারতে কিন্তু রাজনৈতিক গোষ্ঠি থেকে এত বেশী হামলা নেই। আমাদের দেশে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতাকে কেন্দ্র করে ভারতের চেয়ে হামলার আশংকা বেশী। দেশে অনেক সাংবাদিক প্রাণ দিয়েছেন.. গৌতম দাশ, শামসুর রহমান… তালিকাটা অনেক দীর্ঘ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী একুশে পত্রিকাকে বলেন, সংবাদমাধ্যম সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে। সংশ্লিষ্টদের উপলব্ধি করা উচিত যে সাংবাদিকরা কোনোভাবেই কারো প্রতিপক্ষ নয়; যদি সাংবাদিক কখনো কারো ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়, ক্ষমতা অপব্যবহারের সমালোচনা করে, তবে তা প্রকারান্তরে শুধরে নেওয়ার সুযোগই সৃষ্টি করে দেয়। সুরক্ষা আইনের বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খুব দরকার বলে মনে করেন তিনি।

সাংবাদিক নির্যাতনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও বিদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন জানিয়ে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামল বলেন, বাংলাদেশে সবসময় সরকারি দলে যারা থাকেন, তারাই সাংবাদিক নির্যাতন করে। আমাদের বিদ্যমান যে আইন আছে যেমন-ওয়েজ বোর্ড আইন, শ্রমআইন, গণমাধ্যম নীতিমালা আইন যেগুলো করতে চেষ্টা করা হচ্ছে সেগুলোও খুব বেশি সাংবাদিকদের পক্ষে যাচ্ছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এখানে আমাদের ব্যর্থতা বেশি। আমাদের ইউনিয়ন দুইভাগ-আমরা আওয়ামী লীগের লেজুড়, কেউ বিএনপির লেজুড়, কেউ বা অন্যদলের লেজুড়। আইন পাশের চেয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার জায়গাটিকেই মূলত আমাদের প্রধান্য দিতে হবে।

চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা ব্যস্ত থাকি নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। মুশকিল হচ্ছে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে আমরা কথা বলতে চাই না। এ পরিস্থিতিতে সিইউজে’র ব্যানারে আমরাই সবার আগে, সবসময় সাংবাদিকদের অধিকার আদায় ও দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলি। যে কারণে সিইউজেকে সবাই সম্মান ও সমীহ করে। সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য সি্ইউজের এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

সাংবাদিক সুরক্ষার বিষয়ে চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি কাজী আবুল মনসুর বলেন, যে হারে সাংবাদিক নির্যাতন বাড়ছে তাতে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আমাদের দেশেও সাংবাদিক সুরক্ষা আইন আজ সময়ের দাবি। বহু আগেই এই আইন করা উচিত ছিল। এটা একসময় আলোচনা হয়েছিল, পরে ধামাচাপা পড়ে যায়। সাংবাদিক শামসুর রহমান ও গৌতম হত্যার বিচার তরান্বিত হতো যদি এই ধরনের আইন বলবৎ থাকত। যেটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু আছে। এই আইনটির জন্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দকে সচেতন হওয়া দরকার, যুৎবদ্ধ আওয়াজ তোলা দরকার বলে মনে করেন চট্টগ্রামের এ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত) © All rights reserved © 2019 DailyCoxnews
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com