• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

চীনে বন্যপ্রাণীর ব্যবসা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধের দাবি

রিপোর্টার
আপডেট : শনিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
f6c646d174bde8393c1b09a2f4f7a4a9 5e3dedbde86f6

এ ভাইরাস যেন আরও বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত ব্যবসা স্থগিত করেছে বেইজিং। তবে সংরক্ষণবাদীরা মনে করছেন, শুধু এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তাদের বক্তব্য, বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত বাণিজ্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হলে তা মানুষের স্বাস্থ্যজনিত নিরাপত্তার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী চোরাকারবার থামাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ঐতিহ্যগতভাবে চীনা ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেহের অংশ ব্যবহার হয়। এছাড়া চীনাদের খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকম বন্যপ্রাণীর চাহিদা রয়েছে। ফলে দেশটিতে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের নিয়েও বাণিজ্য বেড়েই চলেছে।

সংক্রমণের অন্যতম প্রধান উৎস’

মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের ৭০ শতাংশের বেশি ধরনের সংক্রমণই বিভিন্ন প্রাণী থেকে, বিশেষ করে বন্যপ্রাণী থেকে শুরু হয় বলে প্রতীয়মান হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন করোনা ভাইরাস বাদুর থেকে ছড়ানোর বড় একটি আশঙ্কা রয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার আগে এই ভাইরাস অন্য কোনও অচেনা প্রাণীর মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।

সিভিয়ার অ্যাকিউট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) ও মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোমের (মার্স) পেছনে থাকা ভাইরাসও বাদুর থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। তবে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার আগে সেগুলো সিভেট জাতীয় বিড়াল এবং উটের মধ্যে ছড়ায় বলে ধারণা করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের ডক্টর বেন এমব্রেক বলেন, ‘এমন ধরণের বন্যপ্রাণী ও তাদের বাসস্থানের সংস্পর্শে আমরা আসছি, যেগুলোর সঙ্গে একসময় মানুষের কোনও সম্পর্কই ছিল না। হঠাৎই আমরা এমন সব ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছি যেগুলো আমাদের জন্য একেবারেই নতুন।’

তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অচেনা এসব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া আর পরজীবীর কারণে অনেক রকম নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মধ্যে।

ভূ-পৃষ্ঠে থাকা প্রায় ৩২ হাজার জাতের মেরুদণ্ডী প্রাণী সম্পর্কে এক গবেষণায় জানা যায়, এসব প্রাণীর ২০ শতাংশই বৈধ বা অবৈধভাবে বৈশ্বিক বন্যপ্রাণী বাজারে বেচাকেনা হয়ে থাকে। সংরক্ষণবাদী গ্রুপ ডব্লিউডব্লিউএফ-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাজারে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের পরই এটি বিশ্বব্যাপী অবৈধ ব্যবসার তালিকায় চতুর্থ।

চীনের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত ব্যবসা। বহু প্রাণী বিলুপ্তপ্রায় হওয়ার কারণ হিসেবে এই বাণিজ্যকে দায়ী মনে করা হয়।

ডক্টর এমব্রেক মনে করেন, করোনা ভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী রোগ যেন ভবিষ্যতে না হয়, তা নিশ্চিতে এখনই বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত বাণিজ্য বন্ধ করা উচিত। তার ভাষায়, ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদে এ বাণিজ্য বন্ধ করা উচিত। কারণ আমরা জানি যে প্রাণঘাতী রোগ ছড়ানোর মতো ভয়াবহ কোনও ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।’

বিশেষজ্ঞ ও অ্যাক্টিভিস্টদের আশঙ্কা থাকলেও বন্যপ্রাণী ব্যবসায় চীনের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা যে অস্থায়ী হবে, তা নিশ্চিত করেছে বেইজিং। তিনটি চীনা সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশিত এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘চীনে মহামারী অবস্থা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরণের বন্যপ্রাণী বিক্রি, স্থানান্তর ও পোষা নিষিদ্ধ থাকবে।’ ২০০২ সালে সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরও বেইজিং একই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিল।

সংরক্ষণবাদীরা বলছেন, সে সময় নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কর্তৃপক্ষ নজরদারিতে শিথিলতা নিয়ে আসে। ফলে বন্যপ্রাণীর বাণিজ্যও ধীরে ধীরে শুরু হয়ে যায়।

পরিস্থিতির পরিবর্তন?

চীনে বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। এ বছরের সেপ্টেম্বরে প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছে বেইজিং, যেটিকে বলা হয় কনভেনশন অন বায়োলজিকাল ডাইভার্সিটি। ১৯৯২ সালে স্বাক্ষরিত এই সম্মেলনটির মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টার গভার্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ১০ লাখের মতো প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। নিজ দেশের বন্যপ্রাণীদের ঝুঁকিতে ফেলছে চীন, শুধু তা-ই নয়, বরং দেশের বাইরের জীববৈচিত্র্যকেও ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে দেশটির বিরুদ্ধে। অন্যতম বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো নির্মাণে চীনের নেওয়া বেল্ট অ্যন্ড রোড উদ্যোগের সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, চীন প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছে।

সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদকীয়তে দেশটির নিয়ন্ত্রণহীন বন্যপ্রাণী বাজারের সমালোচনা করা হয়েছে। সংরক্ষণবাদীরা বলছেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে এখন নিজেদের সদিচ্ছা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে বেইজিং। উদাহরণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরছেন চীনে হাতির দাঁত আমদানি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত সফলভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টি। আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর অনেক বছর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগের পর চীন সরকার ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যপ্রাণীর দেহের অংশ দিয়ে তৈরি করা পণ্যের বিষয়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা শুধু চীনে নয়, বরং পুরো দুনিয়াতেই বাস্তবায়ন করা উচিত। সূত্র: বিবিসি।

 

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা