মেজর (অব:) সিনহা : ১৩টি প্রশ্নের কী জবাব? | Daily Cox News
  • মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৫ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মেজর (অব:) সিনহা : ১৩টি প্রশ্নের কী জবাব?

ডেস্ক রিপোর্ট
আপডেট : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০
Screenshot 20200821 124215

গত ৩১ জুলাই কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রোডের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে ইন্সপেক্টর লিয়াকতের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খান। এই হত্যাকাণ্ড জনমনে গভীর রেখাপাত করেছে। সম্ভাব্য অস্থিরতা নিরসনে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। স্মরণকালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংশ্লিষ্ট দুই বাহিনীর প্রধান যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছেন। পরে সিনহার বোনের দায়ের করা মামলার ৯ জন আসামির মধ্যে প্রধান আসামিসহ সাতজন গ্রেফতার হয়েছেন এবং উচ্চ পর্যায়ে গঠিত যৌথ কমিটির তদন্ত কার্যক্রম চলছে। আর মামলার তদন্ত পরিচালনা করছে র‌্যাব।

মেজর (অব:) সিনহা ১৬ বছর চাকরি করে স্বেচ্ছায় অবসরে যান। তিনি ‘এসএসএফ’-এরও সদস্য ছিলেন। সংস্কৃতিমনা মেধাবী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই অফিসার চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বিভিন্নমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার মায়ের ভাষ্যমতে, মেজর সিনহা বিশ্বভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে চলমান করোনা মহামারীর জন্য তার অভিযান পিছিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি প্রিয় মাতৃভূমির সৌন্দর্য বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য ‘জাস্ট গো’ নামের প্রমাণ্যচিত্র তৈরি করছিলেন। এ জন্য ফিল্ম তৈরিতে পারদর্শী স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। প্রথমে প্রায় আড়াই মাস রাজশাহীতে শুটিং শেষ করে গত ৩ জুলাই কক্সবাজার যান প্রামাণ্যচিত্রের পরবর্তী চিত্রগুলো ধারণ করার জন্য।

ঈদের ছুটির মধ্যে তার হত্যার ঘটনা সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ভারতের গৌহাটি থেকে ‘নর্থইস্ট নাও’ নামক নিউজ পোর্টাল প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘Assassinated Bangladesh Army ex Major was into drugs, training ARSA’ অর্থাৎ বাংলাদেশে নিহত আর্মি মেজর মাদক কারবারে এবং মিয়ানমারের জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আরসা’কে প্রশিক্ষণে জড়িত ছিল (The Daily Star : 06.8.2020)। কারণ অনুসন্ধানের আগেই আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশ আর্মি মিয়ানমারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সেখানকার জঙ্গিদেরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে যে যাই বলুক আমাদের এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের আসল কারণ খুঁজে বের করতেই হবে, যেন মূল অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা যায়।

ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্লেষণ, ভিডিওচিত্র, টেলিকথোপকথন ইত্যাদি বেরিয়ে আসছে। এসব তথ্য অবশ্যই যাচাই-বাছাইয়ের দাবি রাখে। এ ধরনের প্রকাশ্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্যগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে কিছু সম্ভাব্য কারণ বের হয়ে আসে।

ক. বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি : জবাবদিহিবিহীন ‘ক্রস ফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ ইত্যাদির মাধ্যমে সন্দেহভাজন অপরাধী হত্যার অবাধ ক্ষমতার চর্চা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মেজর (অব:) সিনহাকে হত্যার সুযোগ করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাই অপরাধী গ্রেফতার, বিচারের রায় প্রদান এবং শাস্তিস্বরূপ হত্যা কার্যকর করছে তাদের রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে। এ ধরনের কোনো হত্যাকাণ্ডেই সংশ্লিষ্ট সদস্যদের কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসেছে, টেকনাফে ‘ক্রস ফায়ারে’ হত্যার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চালু হয়ে গিয়েছিল।

খ. ওসি প্রদীপকে দানব হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়া : ওসি প্রদীপ একদিনে দানব হয়ে উঠেনি। বিভিন্ন সময় একাধিকবার অনৈতিক কার্যকলাপের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত ও স্ট্যান্ড রিলিজের রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তাকে টেকনাফের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করা হয়েছে। এখানে তার গত দুই বছরের চাকরিকালে ৪৮টি বন্দুকযুদ্ধে মোট ৮৭ জন মানুষ নিহত হয়। আরো আশ্চর্যজনক হলো, এসব হত্যার পর তাকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক ২০১৯-এ ভূষিত করা হয়, যা তাকে আরো উৎসাহিত করে। কিছু দিন আগে তিনি অপরাধীদের বাড়িঘরে গায়েবি আগুন দেয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে দুদক ওসি প্রদীপের ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। জানা যায়, তিনি ক্রসফায়ার বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

গ. মেজর (অব:) সিনহার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস : ওপেন সোর্স থেকে জানা যায়, মেজর সিনহা সম্ভবত ওসি প্রদীপের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের সময় তার কৌশলী প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে ওসি প্রদীপ অনেক অপ্রকাশযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে ফেলেছিলেন, যেখানে হয়তোবা অন্য কারো মুখোশ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল।

ঘ. প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া : ওসি প্রদীপ টেকনাফের ইয়াবা গডফাদারদের প্রশ্রয়ে থেকে তাদের অবাধ সুযোগ দিয়েছেন আর ছোট ছোট চোরাকারবারিদের ধরে ক্রসফায়ারে দিয়েছেন বা চাঁদা আদায় করেছেন। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন।

ঙ. অস্বীকারের সংস্কৃতি : আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বরাবরই অস্বীকার করে আসছে যা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের উৎসাহই জুগিয়েছে। এমনকি ঘটনা পরবর্তী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রধান ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর অস্তিত্ব নাকচ করে দেন।

হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি পর্যালোচনা করলে মনে হয়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত। বেশ কয়েকটি প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না।

ক. মারিশবুনিয়া গ্রামের তিনজন লোককে পুলিশের করা মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে। ওই তিনজন লোক (বর্তমানে গ্রেফতারকৃত) মেজর সিনহাকে ডাকাত বানানোর জন্য মসজিদের মাইকে ডাকাত বলে প্রচার করেছিলেন। পরে সিনহা পাহাড় থেকে নেমে এলাকাবাসীকে পরিচয় দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ওই তিনজন ঈঘএ-অটোরিকশা দিয়ে সিনহার গাড়ি অনুসরণ করে এবং হত্যাকাণ্ড ঘটা পর্যন্ত শামলাপুর চেকপোস্টে উপস্থিত ছিল। কেন?

খ. হত্যাকাণ্ডের সময় মাত্র ১০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদের মোয়াজ্জিন ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ। এর কারণ কী?

গ. মেজর সিনহা আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুই হাত উঁচু করে নিজের পরিচয় দেয়ার পরও তাকে গুলি করা হলো কেন?

ঘ. পাশে বসে থাকা সিফাত প্রথমে নেমে তার এবং গাড়িচালক মেজর সিনহার পরিচয় দেয়ার পরও ইন্সপেক্টর লিয়াকত মেজর সিনহাকে গাড়ি থেকে নামার আদেশ করেন। মেজর সিনহাই কি তাহলে পরিকল্পনার লক্ষ্যবস্তু ছিল?

ঙ. হত্যার পর রেস্টহাউজে গিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির যন্ত্রপাতি : হার্ডডিস্ক, ক্যামেরা, ল্যাপটপ, মাইক ইত্যাদি জব্দ করা হয়। রেকর্ড বিনষ্ট করার জন্যই কি এগুলো জব্দ করা হয়েছিল?

চ. বাহারছড়া থেকে কক্সবাজার হাসপাতালে ৪৫ মিনিটের পথ ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে পৌঁছার মানে হলো মৃত্যু নিশ্চিত করে হাসপাতালে নেয়া। তাছাড়া গুলিতে আহত সিনহাকে ওসি প্রদীপ এসে পুনরায় আঘাত করারও উদ্দেশ্য তার মৃত্যু নিশ্চিত করা। অর্থাৎ যেকোনো মূল্যে সিনহার মৃত্যুই কি উদ্দেশ্য ছিল?

ছ. হত্যার পর উল্টো ভিকটিম সিফাতের নামে পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দেয়া ও হত্যা মামলা করার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কী ছিল? সাক্ষীকে কারান্তরালে রেখে সাক্ষ্যদান থেকে দূরে রাখা?

জ. হত্যার পর এসপি মাসুদ হোসেনের সাথে ওসি প্রদীপ ও ইন্সপেক্টর লিয়াকতের কথোপকথন যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক করে। বিশেষ করে এসপি মাসুদ হোসেনের, ‘তোমাকে গুলি করেছে লাগে নাই, পরে তুমি গুলি করেছ সেটা লেগেছে’ এই উক্তি ইঙ্গিতপূর্ণ নয় কি? তিনি কি আগে থেকেই জানতেন?

ঝ. হত্যার পর ওসি প্রদীপের ছুটি নেয়া, কয়েক দিন উধাও থাকার পর চট্টগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি এবং পরে পুলিশ পাহারায় কক্সবাজার এসে আদালতে আত্মসমর্পণের বিষয়টি কি কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া? সাধারণত ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের পরই সন্দেহভাজন হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ বা উইথড্র হওয়ার কথা নয় কি?

ঞ. মেজর সিনহা হত্যার ঘটনাই শেষ ঘটনা বলে জানানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। তার মানে কি এই নয় যে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রচলিত ছিল?

ট. ‘নর্থইস্ট নাও’ নামক একটি বিদেশী নিউজ পোর্টাল তড়িঘড়ি করে এই হত্যার বিষয়ে মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করার বিষয়টি কিসের ইঙ্গিত? কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই মেজর সিনহাকে ইয়াবা এবং ‘আরসা’-এর সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্য কী?

ঠ. হত্যার পরদিন সিনহার ঢাকার উত্তরার বাসায় গিয়ে পুলিশের অফিসার সিনহার মাকে অনেক প্রশ্নসহ মেজর সিনহার রাজনৈতিক পরিচয়ও জানতে চান। একজন মৃত মেজরের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়া সচেতন মহলে সন্দেহজনক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। কোন উদ্দেশ্যে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়া হলো?

ড. হত্যার পর অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারদের সংগঠন ‘রাওয়া’ (RAOWA) সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজারের ‘এসপি’র ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে পরদিন কক্সবাজারের একটি সংগঠন ‘এসপি’ মাসুদের পক্ষে সাফাই গেয়ে সভা করেন। এই প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট ‘এসপি’ এর ব্যাপারে সৃষ্ট প্রশ্নকে আরো গভীরতর করার বিষয় নয় কি?

ঢ. শামলাপুর চেকপোস্ট ‘এপিবিএন’-এর। সেখান থেকে ‘পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র’ ৭০০-৮০০ মিটার দূরে। পুলিশি মামলার অন্যতম সাক্ষী (জনৈক নূরুল আমিন) মারিশবুনিয়া থেকে সিনহার রওনা দেয়ার খবর দিলে ‘পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র’র ইন্সপেক্টর লিয়াকত সাবইন্সপেক্টর নন্দদুলাল রক্ষিতের মোটরসাইকেলযোগে তাড়াতাড়ি এপিবিএন চেকপোস্ট আসেন এবং রাস্তায় ড্রাম ফেলে সিনহার গাড়ি আটকে তাকে নামতে বলেন। ইন্সপেক্টর লিয়াকত কেন দ্রুত চেকপোস্টে এসে ‘এপিবিএন’-এর কাছ থেকে দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে সিনহাকে গুলি করলেন?

এই হত্যার মাধ্যমে পুলিশ সদস্যের পেশাদারিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শুধু সিনহার হত্যা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে যা পুলিশের পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গত ২৯ জুলাই ঢাকার মিরপুরে পল্লবী থানার ভেতরে বোমা বিস্ফোরণ, বরগুনায় সিফাতের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন চলাকালে ওসি সাহেবের সহকর্মী পুলিশ সদস্যের গালে জনসম্মুখে কষে চড় বসিয়ে দেয়া, দেশের উত্ত

 

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা