করোনা: প্রবল স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয়রাও | Daily Cox News
  • মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

করোনা: প্রবল স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয়রাও

ডেস্ক রিপোর্ট
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২০
Screenshot 20200825 131936

বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির বিস্তারের প্রেক্ষাপটে গত মার্চে দেশবাসীকে সরকারিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি আশ্রিত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সে নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলার ব্যবস্থা নিতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এরপর সরকারি-বেসরকারি সবমহলের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে অবাধ চলাচল বন্ধ করা সম্ভব না হওয়ায় গত ১৪ মে প্রথমবারের মতো এ ক্যাম্পে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান মেলে। তখন থেকে এ পর্যন্ত ৮২ জন রোহিঙ্গা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, এদের মধ্যে মারা গেছেন ছয় জন। এরপরও ক্যাম্পে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানা হচ্ছে না। ফলে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে সেখানে। এতে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার আশেপাশের স্থানীয়রাও চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তেমনই ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পের মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তিনি বেশি প্রকাশ করেন। মানবিক প্রধানমন্ত্রী করোনার প্রকোপ দেশে শুরু হওয়ার সময়েই দেশবাসীর পাশাপাশি এই ক্যাম্পগুলোতে করোনা ছড়ালে কী পরিণতি হবে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনার কারণে গত ১১ মার্চ থেকে কক্সবাজারের ঘিঞ্জি রোহিঙ্গা শিবিরে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল সরকার।

কক্সবাজার স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ৩ হাজার ৮০৯ জন রোহিঙ্গার নমুনা সংগ্রহ করে মেডিকেল কলেজ ল্যাবে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৭ জনের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। আক্রান্তদের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) আইসোলেশন সেন্টার ও এমএসএফ হসপিটালে আইসোলেশনে চিকিৎসা চলছে। এছাড়া আক্রান্ত পরিবারগুলোর ২শ’ মানুষকে নিজ নিজ ঘরে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. আবু তোহা এম আর এইচ ভূঁইয়া জানান, ‘করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত ৮৭ জন রোহিঙ্গা আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ছয়জন। তবে ক্যাম্পে যাতে লোকজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সে-ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা সত্যিই যে, ঘিঞ্জি শিবির হিসেবে করোনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে যায়।’

কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ) ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দিন দিন করোনা রোগী বাড়ছে। সেখানে নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব এবং অন্যান্য নির্দেশনাও মেনে চলা না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তবে চিকিৎসক এবং ক্যাম্পের সুবিধা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা যতোই উদ্বেগ প্রকাশ করুন না কেন রোহিঙ্গারা আছে তাদের মতো। বিশ্বজুড়ে মহামারি সৃষ্টিকারী নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই রোহিঙ্গাদের। সেখানে যে যার মতো চালিয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল। এতে বেশি ঝুঁকিতে থাকছেন বৃদ্ধ ও রোহিঙ্গা শিশুরা।

বার বার সতর্ক করা হলেও লোকজন নিয়ম-নীতি মানতে চায় না উল্লেখ করে টেকনাফ লেদা শরণার্থী শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘তার ক্যাম্প ঘনবসতি এলাকায় হওয়ায় সেখানে করোনার বেশি ঝুঁকি থাকলেও সেখানকার লোকজন আগের মতোই চলাফেরা করছে। এই নিয়ে ক্যাম্পের ইমাম, শিক্ষক ও মাঝিসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে করোনা রোধে বৈঠকও করা হচ্ছে।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইসোলেশন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে করোনামুক্ত হওয়া এক রোহিঙ্গাকে ফুল ও করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে বিদায় দেওয়া হচ্ছে। (সাম্প্রতিক ছবি)
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইসোলেশন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে করোনামুক্ত হওয়া এক রোহিঙ্গাকে ফুল ও করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে বিদায় দেওয়া হচ্ছে। (সাম্প্রতিক ছবি)

তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি ক্যাম্প মাঝিদের নিয়ে বাঁচতে হলে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে- ব্লকে ব্লকে এমন প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।

তবে রোহিঙ্গাদের কারণে স্বস্তিতে নেই স্থানীয়রা। টেকনাফ শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা গ্রাম। নাফ নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামে স্থানীয়দের চেয়ে ১৪ গুণ বেশি রোহিঙ্গাদের বসতি। ফলে ক্যাম্পে করোনায় আক্রান্তের খবরে সেখানকার স্থানীয়দের ভয়-ভীতিতে দিন কাটছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হ্নীলা ইউপির ৯ ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘তার এলাকায় ৭ হাজার স্থানীয় মানুষের বসতি। কিন্তু সেখানে ১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা গাদাগাদি ভাবে থাকছে। এছাড়া করোনা রোধে স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানছে না রোহিঙ্গারা। করোনা উপসর্গ নিয়ে তার এলাকায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন করোনা পজিটিভ ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘ক্যাম্পে দাতা সংস্থাগুলো দায়সারাভাবে কাজ করছে। কেননা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বসবাসকারীদের অনেকের করোনা উপসর্গ দেখা দিলেও কেউ চিকিৎসা নিচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ক্যাম্পসহ স্থানীয়দের মাঝে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. টিটু চন্দ্র শীল বলেন, ‘রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় ঝুঁকিটা বেশি। তবে এ রোগ যেন শিবিরে না ছড়ায় সে ব্যাপারে প্রতিনিয়ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কক্সবাজারে ১৬’র ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাম্পে লোকজন যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সেজন্য পুলিশ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাতে দোকানপাটে জমায়েত হয়ে আড্ডা না দেয় সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।’

এ পর্যন্ত তিনটি এসএআরআই আইটিসির ২৩০টি শয্যার মাধ্যমে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ স্থানীয়দের কোভিড-১৯-এর সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে ভূমিকা রাখছে জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থাটি।

এ বিষয়ে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র মোস্তফা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন , ‘আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিধি মেনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ