• বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৫৩ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মোনাকোয় পুতিনের বান্ধবীর বিলাসবহুল ফ্ল্যাট

রিপোর্টার নাম :
আপডেট সময় : সোমবার, ৪ অক্টোবর, ২০২১
Putin friend 1

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে মোনাকোতে একটি গোপন লেনদেন হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনী ব্যক্তিদের জন্য কর স্বর্গ হিসেবে পরিচিত এই দেশ। বিশেষ করে এখানকার বিলাসবহুল ক্যাসিনোর আড়ালে চলে গোপন সম্পদের হিসাব-নিকাশ। সেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্টের হাতবদল ঘটেছিল। স্থানীয় একটি নোটারির পক্ষ থেকে ওই চুক্তিতে সই করা হয়েছিল। এর ক্রয়মূল্য ছিল ৩৬ লাখ ইউরো (প্রায় ৩৬ কোটি টাকা)। বিনিময়ে ক্রেতা একটি বিলাসবহুল ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট পেয়েছিলেন; সঙ্গে পেয়েছিলেন পার্কিংয়ের দুটি জায়গা, একটি স্টোররুম ও সুইমিং পুল ব্যবহারের সুবিধা।

বিলাসবহুল এই ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে নতুন মালিক মোনাকোর মনোমুগ্ধকর সৈকত দেখতে পারেন। এছাড়া ওই কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কঠোর যে, কোনো ভ্রমণকারী চাইলেই সেখানে প্রবেশ বা ভবনের বাসিন্দাদের বিরক্ত করতে পারেন না। কমপ্লেক্সের ছাদে একটি মিনি গার্ডেন বা ছোট বাগানও রয়েছে।

ওই ফ্ল্যাটটি যিনি কিনেছিলেন, তার পরিচয় কারও জানা ছিল না। ক্রেতা ছিলেন একজন রহস্যময় ব্যক্তি। আনুষ্ঠানিক নথিপত্রে ওই ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে নাম ছিল ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত একটি অফশোর কোম্পানির। যার নাম ব্রুকভিল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড।

তবে সম্প্রতি প্রকাশিত প্যানডোরা পেপার্সে রহস্যময় ওই ফ্ল্যাটমালিকের পরিচয় বেরিয়ে এসেছে। প্যানডোরা পেপার্সের নথি বিশ্লেষণ করে বিলাসবহুল ওই ফ্ল্যাটির ক্রেতা হিসেবে একজন নারীকে শনাক্ত করেছে গার্ডিয়ান। তার নাম এসভেতলানা ক্রিভোনোগিখ। ২০০৩ সালে ফ্ল্যাটটি কেনার সময় তার বয়স ছিল ২৮ বছর। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে রুশ এই নারী বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।

ক্রিভোনোগিখের নামে তার শহর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে সম্পদ ও ইয়ট ছাড়াও আরও অনেক সম্পদও ছিল তার নামে। এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য ছিল ১০ কোটি মার্কিন ডলার।

এতো সম্পদের মালিক হলেও এসভেতলানা ক্রিভোনোগিখের অতীত ছিল খুব সাধারণ। তিনি একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবনে বাস করতেন। সেসময় তাকে পাঁচটি পরিবারের সঙ্গে রান্নার জায়গা ও বাথরুম ভাগাভাগি করে কাজ করতে হতো।

তবে ৯০-এর দশকে সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের মেয়রের সঙ্গে বন্ধুত্বের পরই ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় ক্রিভোনোগিখের। সেই মেয়র আর কেউ নন, ভ্লাদিমির পুতিন। চলতি শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার আগে নব্বইয়ের দশকে পুতিন ছিলেন সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের মেয়র। এসভেতলানা ক্রিভোনোগিখ পুতিনের প্রেমিকা ছিলেন বলেও শোনা যায়।

২০২০ সালে রাশিয়ার স্বাধীন অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট প্রোইক্ট দাবি করে, পুতিন যখন সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়র ছিলেন তখনই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন ক্রিভোনোগিখ। তিনি পুতিনের প্রেমিকা ছিলেন বলেও কথিত আছে।

তাদের সম্পর্কের সঠিক প্রকৃতি যা-ই হোক না কেন, তাঁরা কাছাকাছি ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁরা দুজন একসঙ্গে উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন বলেও অল্প কিছু প্রমাণ মেলে। এরপর পুতিন রাশিয়ার গোয়েন্দা প্রধান, দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও ২০০০ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে আসেন। তিন বছর পরে ২০০৩ সালে ক্রিভোনোগিখ একটি সন্তানের জন্ম দেন। তাঁর নাম এলিজাবেথ বা লুইজা। প্রোইক্ট দাবি করে, লুইজার বাবা পুতিন। এ নিয়ে ক্রেমলিন অবশ্য কোনো মন্তব্য করেনি। পুতিন সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত জীবন জনসম্মুখে আনেন না। পুতিন ও তাঁর স্ত্রী লুডমিলার দুই মেয়ে রয়েছে। একজনের নাম মাশা ও আরেকজনের নাম ক্যাটরিনা। লুডমিলার সঙ্গে ২০১৩ সালে পুতিনের বিচ্ছেদ হয়।

প্রোইক্ট যখন গোপন খবর ফাঁস করে, তখন লুইজা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে তাঁর জীবনযাপন তুলে ধরেন। তাঁর ইনস্টাগ্রামে পার্টি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত জেট বিমানে করে ভ্রমণের মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। লুইজাকে পুতিনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বরাবরই কৌশলে এড়িয়ে যান। গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।

ক্রিভোনোগিখের গল্পটি শুধু প্রণয়ের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে অর্থের বিষয়টিও। গত দুই দশক ধরে মোনাকোর ওপরে রাশিয়ার প্রভাব বেড়েছে। স্থানীয় আইনজীবী ডমিনিক অ্যানাসটাসিস বলেন, ‘এখানে ধনী ব্যবসায়ী ও রাশিয়ার নাগরিকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া কর স্বর্গ হিসেবে এখানে ট্যাক্স নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। অর্থ কোথা থেকে এল তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। এখানে খতিয়ে দেখার কোনো সংস্কৃতিই নেই। এখানে ট্যাক্সের কোনো ঘোষণা দেওয়া লাগে না।’

মোনাকোয় এমন পেশাদার ট্যাক্স ফার্ম রয়েছে, যাদের সঙ্গে বেশ কিছু আইনি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক রয়েছে যারা বিশ্বজুড়ে গ্রাহক সেবা দেয়। সেখানে বাইরে থেকে সুন্দর একটি ছাদবাগান ছাড়া আর কিছু বোঝার উপায় নেই। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একজন ব্রিটিশ। তাঁর নাম ইয়ামন ম্যাকগ্রেগর। নথি বলছে, তিনিই ব্রুকভিল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ও ক্রিভোনোগিখের বিভিআই নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তিনি কীভাবে অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেন তা জানা যায়নি। তাঁর জীবনীতে বিশেষ কিছু লেখা নেই। বাবা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। ১৯৫০ সালে জন্ম। লিভারপুরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি ট্যাক্স নীতি নিয়ে কাজ করেছেন। ফ্রান্স ও ইতালির ভাষা জানেন।

প্যান্ডোরা পেপারসের নথিতে ম্যাকগ্রেগরের ধনী গ্রাহকদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে গেনাডি টিমচেঙ্কোর নামের এক সোভিয়েত আমলার নাম। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, টিমচেঙ্কোর রয়েছে দুই হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদ। গত ২০ বছর ধরে ম্যাকগ্রেগর তাঁর সম্পদ দেখাশোনা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে জেট বিমান, ৪০ মিটার বিলাসবহুল ইয়ট, যার নাম টিমচেঙ্কোর স্ত্রী এমএস লেনার নামে।

টিমচেঙ্কো ও পুতিন নব্বইয়ের দশক থেকে বন্ধু। ওই সময় সেন্ট পিটার্সবার্গে তেলের বাণিজ্য করতেন টিমচেঙ্কো। আর উদীয়মান নেতা ছিলেন পুতিন। ১৯৯১ সালে ওই শহরে বিদেশ সম্পর্ক কমিটির প্রধান থাকাকালে পুতিন টিমচেঙ্কোকে তেল রপ্তানির অনুমোদন দেন।

পরে টিমচেঙ্কো গাসভোর নামে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ট্রেড


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর