সিনহাতেই শেষ হোক সব বিতর্ক | Daily Cox News
  • শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:০৪ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

সিনহাতেই শেষ হোক সব বিতর্ক

ডেস্ক রিপোর্ট
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২০
Screenshot 20200820 114842

টেকনাফ মডেল থানার সদর দরজা বন্ধ। পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে থানায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। গত মঙ্গলবার দুপুরে। ছবি: প্রথম আলো
টেকনাফ মডেল থানার সদর দরজা বন্ধ। পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে থানায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। গত মঙ্গলবার দুপুরে। ছবি: প্রথম আলো
কক্সবাজার সদর মডেল থানায় বন্ধ লোহার ফটকের ছোট ফটকটি (পকেট গেট) পর্যন্ত ভেজানো। সেটি ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই রে রে করে তেড়ে আসেন উর্দিপরা কনস্টেবল। জানতে চান—কী পরিচয়, কার কাছে যাবেন?

দেশের সব থানা সব মানুষের জন্য দিনরাত উন্মুক্ত থাকবে, সেটাই পুলিশ প্রবিধানের (পিআরবি) ভাষ্য। তাহলে সদর থানায় ঢুকতে এত জেরা কেন—প্রশ্ন করতেই নিচু হয়ে আসে কনস্টেবলের কণ্ঠস্বর। নরম গলায় বলেন, ‘বুঝতেই তো পারছেন, কী অবস্থায় আছি।’

সদর থানার এই পুলিশ কনস্টেবল সবকিছু পরিষ্কার না করলেও তাঁর ‘অবস্থা’ শব্দটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর কক্সবাজারের পরিস্থিতি কেমন। পুলিশ কনস্টেবলের সঙ্গে এ কথোপকথন গত মঙ্গলবার সকালের। এত কথার পরও শেষ পর্যন্ত ভেতরে যাওয়ার অনুমতি না পেয়ে থানার ফটক থেকেই আমাদের ফিরে আসতে হয়।

এ তো গেল শহরের কথা। কক্সবাজার শহর থেকে ৯১ কিলোমিটার দূরের টেকনাফ মডেল থানায় আমরা যাই মঙ্গলবার দিনে ও রাতে—দুবার। দুবারই চোখে পড়েছে টেকনাফ থানার সদর দরজা বন্ধ। ফটকে নিরস্ত্র পুলিশের বদলে সশস্ত্র পুলিশের (এপিবিএন) পাহারা, হাতে বন্ধ ফটকের চাবি। শুধু জরুরি কেউ এলে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে দরজা খুলে দিচ্ছেন। রাতে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী থানার সামনে গেলে দ্রুত তালা লাগিয়ে দেন দায়িত্বরত কনস্টবেল। বন্ধ ফটকের পাশের দেয়ালে গ্রেপ্তার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশের রংতুলিতে আঁকা বিশাল আকারের ছবি। তার নিচে লেখা, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ’।

আতঙ্কে পুলিশ, অপরাধ রেকর্ড হচ্ছে কম

থানা–পুলিশের এই হাল নিয়ে কথা হয় জেলা পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, শুধু টেকনাফ আর সদর থানা নয়, পুরো জেলার পুলিশ সদস্যরা ভয়াবহ আতঙ্কে আছেন। থানায় মামলা ও সাধারণ ডায়েরির হার কমে গেছে। জেলা পুলিশের কাছ থেকে তিনটি থানার মামলা ও সাধারণ ডায়েরির হিসাব নিয়ে দেখা গেছে, অভিযোগ দায়েরের হার কোনো থানায় অর্ধেক, আবার কোনো থানায় তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। শুধু মামলা–জিডির হারই কমেনি, ইয়াবা কারবারেও তার প্রভাব পড়েছে। এখন প্রায়ই লাখ লাখ পরিত্যক্ত ইয়াবা উদ্ধার করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। যদিও আসামি না ধরে শুধু পরিত্যক্ত ইয়াবা উদ্ধারের এই কর্মকাণ্ডকে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেন।

পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছে টেকনাফ থানার পুলিশ। টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশের হাতে যাঁরা ক্রসফায়ার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, এখন সেই পরিবারগুলো মুখ খুলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সোচ্চার এসব পরিবারের অনেক সদস্য। পুলিশের আশঙ্কা, ইয়াবা কারবারি ও তাদের লগ্নিকারীরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। তারা একজোট হয়ে পুলিশের ওপর হামলাও চালাতে পারে। এই আশঙ্কায় শুধু টেকনাফ নয়, সারা জেলায় পুলিশের টহল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, সড়ক থেকে তল্লাশিচৌকি তুলে নেওয়া হয়েছে, পায়ে হাঁটা টহলও (ফুট প্যাট্রোল) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জেলার কোথাও পুলিশ সদস্যদের একা একা ঘুরতে দেখা যাচ্ছে না।

কাল রূদ্ররূপে, আজ অসহায়

কক্সবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন, তা একটি ঘটনা বললেই পরিষ্কার বোঝা যাবে। দুদিন আগে জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা একজন সাংবাদিকের কাছে জানতে চান, তিনি কক্সবাজার থেকে টেকনাফে যেতে চান। এই পথে যাওয়া তাঁর জন্য নিরাপদ হবে কি না। ওই সাংবাদিক এ কথা শুনে অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে থাকেন।

কক্সবাজার পুলিশের এই ‘অসহায়’ চেহারা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল রুদ্ররূপে। টেকনাফের মানুষ সে রূপ দেখেছে। মানুষের মোবাইল ফোনে এখন একটি ভিডিও ভেসে বেড়াচ্ছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, লকডাউনের সময় বাজারে জিনিসপত্রের দাম যাতে না বাড়ে, সে ব্যাপারে সতর্ক করছেন তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। ভিডিওতে তিনি বলছেন, ‘কেউ যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়, দরকার হলে তাকে নিয়ে আমি মেরিন ড্রাইভে যাব। সেখানে যা করার তা–ই করব।’ মেরিন ড্রাইভে নিয়ে যাওয়ার অর্থ যে ক্রসফায়ারে প্রাণ হারানো, তা কক্সবাজারের মানুষ হাড়ে হাড়ে বোঝেন। দুই বছরে মেরিন ড্রাইভে শতাধিক মানুষ ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন।

এত দিন টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশ কথায় কথায় যে মেরিন ড্রাইভ নিয়ে গরম বক্তৃতা করতেন, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাতেন, হুমকি দিতেন; সেই মেরিন ড্রাইভই এখন তাঁর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাঁর একার নয়, গোটা পুলিশ বাহিনীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে মেরিন ড্রাইভের একটিমাত্র হত্যাকাণ্ড। এ নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে যে তিক্ততা শুরু হয়েছে, তা নিয়ে সব মহলেই উদ্বেগ রয়েছে।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ সিনহার তিন সহযোগী শ্রিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও তাসকিন রিফাত নূরকে আটক করে। রিফাতকে ছেড়ে দিলেও বাকি দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শিপ্রার বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা করে রামু থানার পুলিশ। নীলিমা রিসোর্ট থেকে তাঁদের ভিডিও তৈরির যাবতীয় সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

সিনহা হত্যার ঘটনায় হইচই শুরু হয় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার পর। বিশেষ করে পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলতে থাকে।

এই দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়

সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভেতরে ছোটখাটো দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের পর থেকে তা অনেকটা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। র‌্যাবে কর্মরত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বাগ্‌বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনার নজিরও আছে। কয়েক বছর আগে পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরের বিদ্বেষ থামাতে র‌্যাবকে পুলিশের অধীন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনের বিশেষায়িত বা অভিজাত বাহিনী করার সুপারিশ করা হয়েছিল। র‌্যাবে পদায়ন নিয়ে এখনো পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। বিশেষ করে পুলিশ সুপার (এসপি) পদের কর্মকর্তারা অধিনায়কত্ব পান না বলে র‌্যাবে যোগ দিতে চান না।

তবে এত দিন এসব নিয়ে কথা না হলেও পুলিশের গুলিতে সিনহা নিহত হওয়ার পর সেই দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। এক পক্ষ প্রকাশ্যে অভিযোগ করে, সিনহাকে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। আরেক পক্ষ থেকে বলা হয়, এটা ঠান্ডা মাথার খুন নয়, তাৎক্ষণিক ঘটনার ফল। দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্কের আলোড়ন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ পরিস্থিতি সামাল দিতে কক্সবাজার সফর করেন। সেনাপ্রধান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক সম্ভবত এই প্রথম যৌথভাবে কোনো সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন। দুই বাহিনীর প্রধান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর দায় বাহিনীর ওপর পড়বে না। এতে দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় ধরবে না। এর এক দিন পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়, পুলিশ আশ্বস্ত করেছে, এটাই শেষ ঘটনা।

আইএসপিআরের এই বিজ্ঞপ্তি নিয়েও পুলিশের ভেতরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ওই সময় প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ বাহিনী বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। তাঁদের ভাষ্য হলো, এ ঘটনা যিনি বা যাঁরা ঘটিয়েছেন, সব দায় তাঁর বা তাঁদের। এর সঙ্গে বাহিনীর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সে কারণে ‘এটাই শেষ ঘটনা’ এ রকম নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তবে দুই প্রধানের এই ঘোষণা থেকে যে বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, কথিত ক্রসফায়ারের যেসব ভাষ্য পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে সব সময় দেওয়া হয়েছে, তা মোটেই চূড়ান্ত সত্য নয়।

জড়িয়ে পড়েছেন অবসরপ্রাপ্তরা
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহত হওয়ায় সেনাবাহিনীর প্রধান এবং পুলিশ বাহিনীর প্রধান মর্মাহত জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এটাকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বললেও তা আর ‘বিচ্ছিন্ন’ থাকেনি। সবকিছুই পাল্টাপাল্টি হয়ে গেছে।

সেনাপ্রধান ও পুলিশ মহাপরিদর্শক যেদিন কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলন করেন, সেদিনই ঢাকার মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন। ৫ আগস্টের সেই সংবাদ সম্মেলনে রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত ‘ক্রসফায়ারে হত্যা’ বা ‘হারিয়ে যাওয়ার’ মাধ্যমে ব্যক্তিকে গায়েব করে অপরাধ দমনের প্রবণতার নেতিবাচক দিক প্রকাশ পাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগতভাবে প্রত্যক্ষ উৎসাহ কিংবা পরোক্ষ প্রশ্রয় না পেলে এ ধরনের অপরাধ কখনোই প্রবণতায় রূপান্তরিত হতে পারে না। এরপর রাওয়া ক্লাবের সেক্রেটারি জেনারেল লে. কর্নেল (অব.) এ এন মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হলে দরকার পড়লে তাঁরা রাস্তায় নামবেন।

জেলার পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কে
থানায় মামলা ও জিডির হার কমে গেছে
প্রায়ই লাখ লাখ পরিত্যক্ত ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের এই বক্তব্যের পর পুলিশও কথা বলতে শুরু করে। বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এবং রিটায়ার্ড পুলিশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ