বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, ০৫:০৮ অপরাহ্ন

দিল্লির দাঙ্গা: এখনও ঘর ছাড়া মুসলিম পুরুষরা, অনাহারে স্ত্রী-সন্তান

আন্তজার্তিক ডেস্ক
আপডেট বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০
দিল্লির দাঙ্গা: এখনও ঘর ছাড়া মুসলিম পুরুষরা, অনাহারে স্ত্রী-সন্তান

করোনা মোকাবেলায় লকডাউনের পর উত্তরপূর্ব দিল্লিতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে সব কিছু। কিন্তু সেখানে এখনও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলছে। ভীতিকর পরিস্থিতি এখনও বিরাজ করছে । দিল্লিতে দাঙ্গা মামলায় মুসলমানদের গণ হারে আটক করা হচ্ছে। নৃশংস এই জাতিগত দা’ঙ্গা হয়েছিল এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে খাজুরি খাস লেনে । এর পর থেকেই গ্রেফতার এড়াতে পা’লিয়ে বেড়াচ্ছে মুসলমান পুরুষরা। উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি অনুপস্থিত থাকায় উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকার পরিবার গুলো প্রচণ্ড ক’ষ্টে দিন কা’টাচ্ছেন।

সাদাসিধে স্বভাবের মেহবুব আলমকে ২৭ নভেম্বর গ্রে’ফতার করা হয়। ২৯ বছর বয়সী এ যুবকের বি’রুদ্ধে আনা হয় দা’ঙ্গায় জ’ড়িত থাকার অ’ভিযোগ। ভীতিকর পরিবেশ এবং গ্রে’ফতার আ’তঙ্কে মহল্লা ছেড়েছেন অনেক পুরুষ। ভিন এলাকায় আত্মগো’পনে কেউ কেউ। কেউ ছেড়েছেন শহর। ২০টির বেশি পরিবারে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। উপার্জনক্ষম এ ব্যক্তিদের উপর পুরো পরিবার নির্ভর করতো।

আলমকে গ্রে’ফতারের ঘটনা অতি সাম্প্রতিক। ক’রোনা লকডাউন চলাকালে এবং এর আগেও গ্রে’ফতার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এ আ’তঙ্কে প্রতিনিয়ত ঘর ছাড়ছেন মু’সলমান পুরুষরা।

ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, সং’ঘাতে ক্ষ’তিগ্রস্ত উত্তর পূর্ব দিল্লির মু’সলিম অধ্যুষিত এলাকাটি থেকে মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ জনকে দা’ঙ্গায় জ’ড়িত থাকার অ’ভিযোগে গ্রে’ফতার করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, মোট গ্রে’ফতারের সংখ্যা ৮০২ জন। লকডাউন চলাকালে গ্রে’ফতার করা হয় ৫০ জনকে। তবে কিছু গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, দা’ঙ্গায় জ’ড়িতের অ’ভিযোগে গড়ে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ জনকে গ্রে’ফতার করা হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে দিল্লি সংখ্যালঘু পরিষদ (ডিএমসি) দিল্লির পুলিশ কমিশনার এস এন শ্রীবাস্তবকে পাঠানো এক নোটিশে জানায়, উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জে’লা থেকে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ জন মু’সলিম যুবককে গ্রে’ফতার করছে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। লকডাউনের পরও গ্রে’ফতার কার্যক্রম চলমান বলে পরবর্তীতে আরেক নোটিশে জানানো হয়।

এলাকাবাসীর অ’ভিযোগ, মু’সলিম সম্প্রদায়কে চা’পে রাখতে, গ্রে’ফতার কার্যক্রম চা’লিয়ে যেতে দা’ঙ্গার ভুয়া ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্রে’ফতারের কারণে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আ’তঙ্ক বাড়ছে। কেন্দ্রীয় স্ব’রা’ষ্ট্র ম’ন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের অ’ভিযোগ, দা’ঙ্গায় জ’ড়িত থাকার অ’ভিযোগ তুলে সাধারণ মানুষকে গণহারে গ্রে’ফতার করছে পুলিশ।

‘আমি বিশ্বাস করি তিনি অন্তত বেঁচে আছেন’

ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজক্লিকের সঙ্গে কথা বলেছেন পারভীন। গ্রে’ফতার এড়াতে ২০ দিন আগে ঘর ছাড়েন তার স্বামী। বলেন, আমাদের হা’রানোর কিছু নেই। তবুও আ’তঙ্ক তাড়া করছে। আমরা অনেক কিছু হা’রিয়েছি। আমাদের ঘর পর্যন্ত জ্বা’লিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন হয়তো স্বামীকে সরিয়ে দেয়া হবে। ন্যায় বিচার পাবো না। পুলিশ হয়তো স্বামীর বি’রুদ্ধে নিজের ঘর জ্বা’লিয়ে দেয়ার মি’থ্যা মা’মলা দিতে পারে। জড়াতে পারে দা’ঙ্গায় জ’ড়িত থাকার অ’পবাদে।

দা’ঙ্গায় ক্ষ’তিগ্রস্ত আরেক নারী রুবিনা (ছদ্মনাম)। বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি আমি নিশ্চিত ছিলাম আমাদের মহল্লায় কোনো ঝামেলা হবে না। এখানে বিশৃঙ্খলাকারীরা প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু, কি হলো? দা’ঙ্গা হয়েছে। জ্বা’লাও, পোড়াও, বহু মানুষ হ’তাহত হয়েছে। আমরা কাকে বিশ্বাস করবো? অন্যদের মতো আমার স্বামী গ্রে’ফতার হলে কি করবো? কোথায় যাবো? আমি তাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো; কিন্তু মিথ্যে মা’মলায় এক ঘণ্টাও আমি তাকে জে’লখানায় আ’টক দেখতে পারবো না।

স্থানীয় মসজিদ সম্প্রসারণ এবং আলমের গ্রে’ফতারের ঘটনায় উ’ত্তেজনা বিরাজ করছে বলে ধারণা এলাকাবাসীর। পারভীন (ছদ্মনাম) বলেন, আমরা কোমায় আছি। না জীবিত, না মৃ’ত। গেলো ২০ দিন ধরে আমার স্বামী আমাদের সঙ্গে নেই। স্বাভাবিক জীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বসবাস করছি। কোনো স্বস্তি নেই আমাদের মধ্যে।

২৫ ফেব্রুয়ারি দা’ঙ্গায় পারভীনদের তিনতলা ভবনটি পু’ড়িয়ে দেয়া হয়। বলেন, বাড়ি হা’রানোর পর অনেকে আমাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এখন, আমার স্বামী নেই। সত্যি কেউ খবর নেয় না; কতটা য’ন্ত্রণায় আমাদের দিন কাটছে। মানুষ হয়তো মনে করছে, আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। কোনো সহায়তা নেই; সহানুভূতি নেই।

‘বেঁচে থাকার জন্য খাবার কেনার অর্থ নেই’

এক বছর হতে চললো দা’ঙ্গার। ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষ’তি হয়েছে। কিন্তু পুনরুদ্ধারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরিবারগুলো ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে। পুরুষরাই পরিবারগুলোর একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স’ন্তান লালনপালন এবং সংসার দেখভাল করেই জীবন পার করতেন নারীরা।

সায়রা (ছন্দনাম) বলেন, আমরা কেউ তেমন শিক্ষিত না।


এ জাতীয় সংবাদ