মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন

বাঁশখালীর সাগর তীরে ‘সাদা সোনা’ উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট বুধবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২১
বাঁশখালীর সাগর তীরে ‘সাদা সোনা’ উৎপাদন

চট্টগ্রাম: ভোরের কুয়াশা ভেজা পিচ্ছিল মাটিতে নগ্ন পায়ে কাজে ব্যস্ত বাঁশখালীর সাগর উপকূলীয় পূর্ব বড়ঘোনা গ্রামের শামসুদ্দিন। সঙ্গে আছেন পিতা রাজা মিয়া।

দিন গড়িয়ে দুপুরে মাথার ওপর সূর্যের কড়া তাপ থাকলেও বসে থাকার উপায় নেই এই লবণ চাষীদের। চলতি বছর ৪ কানি জমির মালিককে লবণ চাষের জন্য অগ্রিম দিতে হয়েছে ১ লাখ টাকা।

পারিবারিকভাবে লবণ চাষে জড়িত ৪০ বছর বয়সী শামসুদ্দিন। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এ পেশায় রয়েছেন তিনি।

প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসের শেষদিকে শুরু হয় লবণ মাঠ তৈরির কাজ। উৎপাদন চলে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত।
শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, দৈনিক মজুরীতে শ্রমিক রেখে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে ‘সাদা সোনা’ উৎপাদনের এ কর্মযজ্ঞ।
লবণ চাষীরা জানান, সাগরের লবণাক্ত পানি দিয়েই উৎপাদিত হচ্ছে লবণ। কাঠের রোলার দিয়ে মাঠ সমতল করার পর চারপাশে মাটির আইল দিয়ে ছোট প্লট আকৃতির জায়গা তৈরি করা হয়। এরপর ছোট প্লটগুলো রোদে শুকিয়ে কালো বা নীল রঙের পলিথিন বিছিয়ে দেওয়া হয়। জোয়ার এলে মাঠের মাঝখানে তৈরি করা নালা দিয়ে জমির প্লটে জমানো হয় সাগরের পানি। অনেকে ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিনও ব্যবহার করেন।

এভাবে পানি সংগ্রহ করার পর ৪ থেকে ৫ দিন রোদে রাখা হয়। কড়া রোদে পানি বাষ্পীভূত হয়ে চলে যায় আর লবণ পড়ে থাকে পলিথিনের ওপর।

লবণ চাষ মূলত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। একটু ঝড় বৃষ্টি হলেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শীতের কুয়াশাও লবণের জন্য ক্ষতিকর। উৎপাদিত লবণ থেকে পানি সরে গেলে ব্যাপারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই লবণ কিনে নিয়ে কারখানায় রিফাইনারি মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধন শেষে বস্তা বা প্যাকেটভর্তি করা হয়।

কুয়াশার কারণে চলতি মৌসুমে মাঠ থেকে লবণ তুলতে সময় লাগছে ৬-৮ দিন। আর কিছুদিন পরে কুয়াশা কেটে গেলে ৩ দিনেই উঠবে লবণ। তখন ব্যস্ততা আরও বাড়বে বলে জানালেন চাষীরা।

গত বছর লবণ চাষে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয় বৃদ্ধ রাজা মিয়ার। এই বছরও বাজারে লবণের দাম নেই। বর্তমানে প্রতিমণ দুইশ টাকা দরে ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করছেন তিনি।

ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে এলাকার লবণ চাষী রাজা মিয়া, শামসুদ্দিন, কুতুব চৌধুরী, সরোয়ারদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। কুতুব চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, গেল বছর প্রথমদিকে ন্যায্যমূল্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পরে লবণ বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো এক হয়ে দর কমিয়ে দেয়। এতে প্রতিমণ দেড়শ টাকা করে বিক্রি করতে হয়। ফলে ব্যাপক লোকসান গুণতে হয়।

বাঁশখালীর গণ্ডামারা, ছনুয়া, সরল, বড়ঘোনাসহ অধিকাংশ সাগর উপকূলীয় এলাকায় মাঠের পর মাঠজুড়ে চলছে পলিথিন বিছিয়ে লবণ চাষ। প্রতিদিনই নজর রাখতে হচ্ছে পলিথিন ছিদ্র হয়ে গেল কিনা। ছিদ্র হওয়া মাত্রই পরিবর্তন করে দিতে হয় পলিথিন।

লবণ চাষী সরোয়ার বাংলানিউজকে বলেন, মাঠ থেকে সংগ্রহ করা লবণ ব্যাপারীদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এরপরই লবণে আয়োডিন মিশিয়ে করা হয় বাজারজাত।

চলতি মৌসুমে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, চকরিয়া, কক্সবাজার, মহেশখালী, টেকনাফ, কুতুবদিয়া এলাকার সাগর তীরবর্তী প্রায় ৭০ হাজার একর জমিতে আধুনিক পলিথিন ও সনাতন পদ্ধতিতে চলছে লবণ চাষ।

গণ্ডামারা এলাকার লবণ ব্যবসায়ী আবু আহমদ বলেন, বাঁশখালীতে যে লবণ উৎপাদন হয় তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বাইরেও রফতানি করা যাবে।


এ জাতীয় সংবাদ